এ সম্পর্কিত আরও খবর
অভিনেতা রাহুল ছেলে সহজকে চিঠিতে কী লিখেছিলেন
- ডেস্ক রিপোর্ট
- প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম
-
ছবি: সংগৃহীত
তালসারি সৈকতে শুটিং করতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা গেলেন পশ্চিমবঙ্গের সুপরিচিত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। গতকাল ২৯ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের দিঘার কাছে একটি ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৩ বছর। ২০২১ সালে বাবা দিবসে পুত্র সহজকে একটি আবেগময় চিঠি লিখেছিলেন রাহুল। চিঠিটি পোস্ট করেছিলেন ফেসবুকে। তাঁর স্মরণে চিঠিটি আবার প্রকাশ করা হলো।
এই চিঠিটা আজকে ‘ফাদারস ডে’ বলে লিখতে বসা। যদিও তোমার বাবা নিজে বেহদ্দ বাংলা মিডিয়াম। জীবনেও ‘ফাদারস ডে’, ‘মাদারস ডে’—এগুলো আলাদা করে জানত না, কিন্তু কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, আমারও আজকাল এ সব উদযাপন করতে ইচ্ছা করে। আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত।
জানো সহজ, আমি আর তোমার মা তখন থেকে বন্ধু যখন তোমার মায়ের ১৪ বছর বয়স ছিল, আর আমার ২১। সব ধারাবাহিকে আমরা ভাই-বোন। যেহেতু ছোট, তাই অন্যদের ছেড়ে শেষে আমাদের শট নেওয়া হতো। আর আমরা দুজন সেটের কোনায় বসে আড্ডা মেরে যেতাম।
তোমার মা ছিল বেহালার একজন অ্যাকাউন্টস শিক্ষকের মেয়ে আর আমি খুব সাধারণ এক সরকারি চাকুরের ছেলে। আমরা দুজন এই ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, মন দিয়ে অভিনয়টুকু করতে। তোমাকে এই গল্প কেন বলছি, জানো?
যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তাহলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড, যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে—ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা মা।
এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার, আমি তোমাকে অনুরোধ করব প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিয়ো। কারণ, যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছেন, তিনি হয়তো তোমার বাবা-মাকেও ছোট দেখেছেন।
উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাঁচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই। এ রকম অশিক্ষায় তুমি বড় হবে না, এটুকু আশা তো করতেই পারি, কী বলো?
আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে, দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মা–ও রেখেছে।
তোমার মায়ের তোমার জন্য অনেক সংগ্রাম, অনেক আত্মত্যাগ। তুমি কতটা মনে রাখবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত। আজ তোমার মা ইনস্টাগ্রামে যথেষ্ট অ্যাসথেটিক ছবি দেওয়ার পরও উড়ো কমেন্ট ভেসে আসে—‘লজ্জা করে না আপনার? আপনি কিনা মা?’
না, এ নিয়ে কোনও দুঃখবোধ আছে ভেবো না, গন্ডারের চামড়া ধার নিয়ে তবে সেলিব্রিটি হওয়া যায়, এ আমরা শিখে গিয়েছি। শুধু তোমাকে বলছি, তোমার মায়ের লড়াইয়ের একটা আন্দাজ দেওয়ার জন্য।

আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে, দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মা–ও রেখেছে। কিন্তু আমি চাইব, তুমি সেই ক্ষতগুলোর শুশ্রূষা করবে। মায়ের পিঠের ছুরিগুলো যদি সরাতে না–ও পারো, তোমার একটু আদরই মায়ের জন্য যথেষ্ট হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কোন হরিদাস পাল যে তোমাকে এত জ্ঞান দিচ্ছে (দিচ্ছি)? আমি তোর বাপ (হা হা), দূর সম্পর্কেরই হই, বাপ তো বটে! সেই উপলক্ষে একটু জ্ঞান দেওয়ার অধিকার জন্মে যায়ই।
আমি তোমাকে আমার ভাগের সবকটা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো এরপর থেকে।
আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা। বাংলা। হ্যাঁ, বাংলা ভাষা। আর শুধু সেই বাংলা ভাষা নয়, যেটা আমরা দক্ষিণ কলকাতায় বলি। বাংলা তার সমস্ত উপভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে যে প্রবল ঐশ্বর্যের অধিকারী, সেই সব ঐশ্বর্য তোমাকে দিয়ে দিলাম।
সবই দিয়ে দিলাম, যা যা আমার বলে আমি জানি। শুধু তোমার একটা প্রশ্নের উত্তর ছাড়া। তখন তুমি সদ্য মায়ের সঙ্গে আলাদা হয়েছ।
প্রায় এক বছর পর তুমি আমাদের বেডরুমে ঢুকে এদিক ওদিক দেখে আমাকে প্রশ্ন করেছিলে, ‘আমি এই ঘরে থাকতাম না, বাবা?’
আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘হ্যাঁ।’
তুমি প্রশ্ন করেছিলে, ‘তারপর কী হলো? এখন আর থাকি না কেন?’
বিশ্বাস করো, সেই প্রশ্নের উত্তর সেদিনও ছিল না, আজও নেই। ক্ষমা কোরো।
সম্পাদক ও প্রকাশক: Muhammad Awal
Next Waves Ltd.
স্বত্ব © নিউস এক্সপ্রেস মিডিয়া লিমিটেড
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
মন্তব্য করুন